পরামর্শ/টিপস

করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) মোকাবিলায় যা প্রয়োজন

করোনাভাইরাসকে বৈশ্বিক মহামারি ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ১১ মার্চ বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১০টার দিকে এ ঘোষণা দেয় সংস্থাটি। সহজভাবে বলতে গেলে, কোনো রোগ যদি একই সময়ে বিভিন্ন দেশে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে, তাকে প্যানডেমিক বলা হয়। এর আগে গত ৩০ জানুয়ারি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৯ সালের করোনাভাইরাসঘটিত ব্যাধির প্রাদুর্ভাব ও তার পরবর্তী সময়ে এর মহাবিস্তারকে জনস্বাস্থ্যের জন্য আন্তর্জাতিক গুরুত্ববিশিষ্ট জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা দেয়।

ইতিমধ্যে দেশে ইন্টারনেট, সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক গণমাধ্যমগুলোর সুবাদে সার্চ করোনাভাইরাস-২–সংক্রান্ত উপকারি তথ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন ভুল ও মিথ্যা তথ্য, এমনকি আতঙ্ক সৃষ্টিকারী গুজবের অতিদ্রুত বিস্তার ঘটেছে। এমতাবস্থায় রোগটি প্যানডেমিক ঘোষণার ফলে আরও কিছুটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

কোভিড-১৯ মোকাবিলায় প্রয়োজন সচেতনতা। জনসাধারণের ব্যক্তিপর্যায়ে, অর্থাৎ চলাফেরা ও জীবনযাত্রায় যেমন পরিবর্তন আনতে হবে, তেমনি সরকারকেও আরও সচেতন হতে হবে। সেটা কী রকম, সে বিষয়ে একটু আলোচনা করা যাক:

নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া জনাকীর্ণ জায়গাগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। কোনো জরুরি বিষয় ছাড়া বাসায় অযথা লোকসমাগম উপেক্ষা করা উচিত। গণপরিবহন পারতপক্ষে এড়িয়ে চলতে হবে।

বাইরে থেকে এসে সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে ভালোভাবে দুই হাত ধুতে হবে। করোনা ঠেকাতে হাত ধোয়ার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। কারণ, আমরা অনেক সময় নিজের অজান্তেই মুখে, নাকে, চোখে অপরিষ্কার হাত দিই। এতে করে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। সাবান ও হ্যান্ডওয়াশ ব্যবহারের পাশাপাশি ব্যবহার করা যেতে পারে হ্যান্ড স্যানিটাইজার।

যেসব বস্তুতে অনেক মানুষের স্পর্শ লাগে, যেমন সিঁড়ির রেলিং, লিফটের সুইচ, দরজার নব, পানির কল, কম্পিউটারের মাউস বা ফোন, রিকশার বা গাড়ির হাতল, টাকা, বেসিনের হাতল ইত্যাদি ধরলে সঙ্গে সঙ্গে হাত সাবান দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে।

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে মুখে মাস্ক পরে থাকতে বলছেন চিকিৎসকেরা। কখনোই নাক-মুখ না ঢেকে হাঁচি-কাশি দেওয়া যাবে না। ব্যবহৃত টিস্যু বা রুমাল যথাযথ জায়গায় ফেলতে হবে।

আইসক্রিম ও ঠান্ডাজাতীয় খাবার পরিহার করতে হবে। ঠান্ডার সমস্যা দেখা দিলে হালকা গরম পানিতে গড়গড়া করতে হবে। এ ছাড়া সারা দিনই অল্প অল্প পানি পান করে গলা ভিজিয়ে রাখতে পারলে ভালো। দিনে একবার হলেও গরম পানির ভাপ নাক দিয়ে টানতে পারলে ভালো।

চারপাশের পরিবেশ পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। পরিষ্কার কাপড় পরিধান করতে হবে। এই ভাইরাস যদি কাপড়ের ওপর পড়ে তাহলে সাধারণত ৯ ঘণ্টা বাঁচে, তাই কাপড় প্রতিদিন ধোয়া সম্ভব না হলেও অন্তত দুই ঘণ্টা রোদে শুকাতে হবে। নিজের নিত্যব্যবহার্য প্রতিটি জিনিসই আলাদা রাখা উচিত, যেমন প্লেট, গ্লাস, তোয়ালে, টুথপেস্ট ইত্যাদি। একজনের জিনিস আরেকজন ব্যবহার করা উচিত নয়।

কিছু খাওয়া বা রান্না করার আগে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। ডিম, মাছ-মাংস ভালো করে সেদ্ধ করে নিতে হবে। বাসার মেঝে প্রতিদিন স্যাভলন বা লাইসল দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। অপ্রয়োজনে ঘরের দরজা–জানালা খুলে না রাখাই ভালো।

জ্বর, কাশি, গলাব্যথা হলে অবশ্যই চিকিৎসককে দেখিয়ে পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে। পাবলিক টয়লেট ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে।

এগুলো ব্যক্তিপর্যায়ের সতর্কতার পাশাপাশি সরকারকে চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। এই প্যানডেমিকে চিকিৎসক, নার্স ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন। তাঁরা চাইলেও নিজেদের isolate করতে পারবেন না, যেমনটি পারেননি কিছুদিন আগে উদ্ভূত ডেঙ্গু–পরিস্থিতিতে।

করোনা–পরিস্থিতিতে সরকার চীনে প্রচুর হ্যান্ড স্যানিটাইজার, টিস্যু, টয়লেট পেপার পাঠিয়েছে, যা প্রশংসনীয়। স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যাতে তাঁদের প্রয়োজনীয় মাস্ক, স্যানিটাইজার, সাবান, টিস্যু, টয়লেট পেপার ইত্যাদি প্রয়োজনের সময় হাসপাতালে পান, সে জন্য এগুলোর নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।

রেডিও, টেলিভিশন,অনলাইন ও সংবাদপত্রে সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর করোনাভাইরাস–বিষয়ক জরুরি তথ্য-উপাত্ত নিয়মিত প্রচার করা আবশ্যক। বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হলে সব রোগীকে ভর্তি করে বিচ্ছিন্ন করে রাখার মতো পর্যাপ্তসংখ্যক বেড আমাদের হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে নেই। তাই এ ক্ষেত্রে বর্তমানে উন্নত বিশ্বে গৃহীত পদক্ষেপ ‘self-isolation’ কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী নিজস্ব তত্ত্বাবধানে দুই সপ্তাহের জন্য নিজ ঘরে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকবেন। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজনের সময় তৎক্ষণাৎ চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন।

রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতাল করোনা–পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছুটা প্রস্তুত হলেও সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবা এ ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের জন্য অপ্রতুল। ২০১৯ সালে ঢাকার বাইরে যেভাবে ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটেছিল, সে বিষয় মাথায় রেখে দেশের সব জেলা শহরে ও ইউনিয়ন পর্যায়ে একাধিক হাসপাতাল ও চিকিৎসা টিম সার্বক্ষণিকভাবে প্রস্তুত রাখা আবশ্যক।

লেখক: নাফিসা আবেদীন কথা, আবাসিক চিকিৎসক, প্যাথলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
Close
Close