পরামর্শ/টিপস

অভ্যাস, খাদ্যাভ্যাস এবং করোনা প্রতিরোধ, প্রাসঙ্গিক ভাবনা

জীবনের সব ক্ষেত্রে ভালো থাকার জন্য জীবনধারণে অভ্যাসগত পরিবর্তন প্রয়োজন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিসিসি (বিহেভিয়ার চেঞ্জ কমিউনিকেশন) প্রোগ্রামের কর্মকাণ্ডে ব্যাপ্তি ঘটিয়ে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষকে ভালো থাকার পথ দেখানো সম্ভব।

রোগ হলে ওষুধের সাইড এফেক্ট থাকলেও ওষুধ খেতেই হয়। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে রোগবালাই থেকে দূরে থাকা সম্ভব। ঝগড়া–মারামারি হলে যেকোনো মূল্যে উভয়েরই জিততেই হবে, অথচ টলারেন্স পাওয়ার বাড়ানো অথবা মানবতাবোধ বাড়ানোর মাধ্যমে মারামারি থেকে দূরে থাকা সম্ভব।

মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমবেশি সবারই আছে। শরীরে অ্যান্টিবডি যত বেশি থাকবে, রোগবালাই থেকে তত বেশি রক্ষা পাওয়া যায়। আর এই অ্যান্টিবডি বাড়ানোর বিকল্প নেই। মূলত, ফুসফুস এবং হার্ট ঠিক রাখার মাধ্যমে বডির ইমিউন সিস্টেম ঠিক রাখা সম্ভব।

‘আরলি টু বেড, আরলি টু রাইজ, মেকস আ ম্যান হেলদি ওয়েলদি অ্যান্ড ওয়াইজ।’ ভোরে ঘুম থেকে ওঠার অনেক ফজিলত। সকালের মুক্ত বাতাসে হালকা ব্যায়াম, মৃদু রোদে হাঁটা, নামাজের (অন্য ধর্মের নিজ নিজ প্রার্থনা) মাধ্যমে মনের পবিত্রতা দিয়ে শুরু করে ৬টার মধ্যে নাশতা শেষ করা মানে কাজের জন্য অন্যদের তুলনায় দ্বিগুণ সময় পাওয়া। তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠার কারণে সাড়ে ১২টার মধ্যে দুপুরের খাবার এবং সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে ক্ষুধা পাবে বিধায় মানুষ ডিনার/রাতের খাওয়া সময়মতো শেষ করতে বাধ্য। হালকা সাইক্লিং, বৈকালী ব্যায়াম, সাঁতার ইত্যাদি করা হলে রাত ৯টার পর জেগে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। রাতে গভীর ঘুম হবে। গভীর ঘুম হলে পরদিন সকালে আবার সময়মতো ওঠা হবে এবং পূর্ণযৌবনের ধারায় কাজ শুরু হবে। তবে শর্ত হলো তিনবেলা খাবারের মাঝে অযথাই বেশি বেশি চা খাওয়া, বাইরের খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

জাপান সফরে এমন অভিজ্ঞতাই হয়েছে। সকাল ৮টায় টোকিও থেকে সুন্দর পরিপাটি বুলেট ট্রেনে রওনা হয়ে ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার দূরে হিরোশিমা শহরে দুপুর ১২টায় পৌঁছে ট্রেন থেকে নামার সময় মনে হলো ট্রেনের পরিচ্ছন্নতা বেড়েছে। একটা ধূলিকণা অথবা টিস্যু পেপারও নেই। জাপানের মানুষের ব্যবহার পৃথিবীর সেরা। আপনি কোনো স্থানে পৌঁছাতে সাহায্য চাওয়া মানে পারলে আপনাকে জায়গামতো পৌঁছে দিয়ে আসবে। রাত ১২টায় একাকী একটি মেয়ে নির্জন রাস্তায় সাইকেল নিয়ে পথ চলছে অথবা কোনো এক পুরুষচালিত নির্জন রেস্তোরাঁয় ঢুকে ড্রিংক করে আসছে অথচ কোনো ভয় নেই তার মনে। এগুলো আমার নিজ চোখে দেখা। আমরা যেমন টিএসসিতে বসে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিই, আমার মনে হয় ওরা রেস্তোরাঁয় বসে ও রকমভাবেই আড্ডা দেয়। ‘বার’ বলতে ডি-জে, উশৃঙ্খলতা এসবের বালাই নেই।

বাংলাদেশি এক বন্ধুর ছোট দোকানে বাংলাদেশি মুদ্রায় কোটি টাকা সামান্য ছোট একটি তালার নিরাপত্তায় রেখে রাতে চলে এল দেখে আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম। সেখানে ৭০ শতাংশ মানুষ রাত সাড়ে নয়টার মধ্যে ঘুমিয়ে যায় এবং টোকিও শহরে সকাল ৬টা থেকে ৭টায় সাবওয়ে ট্রেনে উপচেপড়া ভিড় দেখা যায়। জাপানের মানুষ যার যার কাজে অনেক বেশি দায়িত্বশীল। সফরকালে রোবটিক নিহন কোডন ফ্যাক্টরি পরিদর্শনকালে দেখে আশ্চর্য হলাম যে মালিক পর্যায়ের লোকজন আমাদের যখন কারখানা দেখাচ্ছিলেন, তখন কোনো ইঞ্জিনিয়ার অথবা সাধারণ স্টাফকে কাজ বাদ দিয়ে আমাদের সালাম দেওয়া অথবা কথা বলতে দেখলাম না। সুযোগও নেই, কারণ চেইন উৎপাদন প্রক্রিয়ায় একজন দেরি করা মানে পুরো সিস্টেমে ব্যাঘাত। তা ছাড়া বসদের তেল মেরে বেতন বাড়ানো অথবা পদোন্নতির চিন্তাও তেমনটা নেই। কাজ শেষে বাড়ি ফিরতে আমাদের মতো লাফিয়ে রাস্তা পারাপার নেই। রাস্তায় গাড়ি নেই, সিগনাল চলছে বলে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা—এগুলো সাধারণ প্র্যাকটিস। জাপানের গুণাবলি বলে শেষ হবে না বলেই হয়তো বা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে জাপান স্টাডিজ বলে একটা সাবজেক্ট আছে। প্রশংসার মাঝে একটি কথা না বললেই নয়, ধরুন একজন বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সে সহকারী অধ্যাপক হওয়া পর্যন্ত ব্যাপক সহযোগিতা পাবেন। কিন্তু অধ্যাপক অথবা তদূর্ধ্ব ক্ষেত্রের পদোন্নতির বিষয়ে উল্টো।

আমরা এগুলো পারি না কারণ আমাদের চাকরির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের কাজ যেমন—বাচ্চাদের স্কুলে আনা নেওয়া, অন্যান্য ব্যবসায় জড়িত থাকা, শ্রমিক রাজনীতির মাধ্যমে সুবিধার চেষ্টা করা, বড় কর্তা-মন্ত্রীর বাসায় যাতায়াত করাসহ অন্যান্য অনেক কাজে জড়িত থাকতে হয়। বড় বড় দোকানে মালামাল চুরি হওয়ার বিষয়ে নিরাপত্তা নেই বললেই চলে।

অন্যের সম্পদ চুরি করে ব্যাংক–ব্যালেন্স বাড়িয়ে লাভ কী? করোনাভাইরাস প্রাণ নিয়ে নিলে ব্যাংকে জমানো টাকা দিয়ে কোনো লাভ হবে না, সেটা হয়তো তারা ভালো করেই জানে। অন্যের সম্পদ চুরির কী প্রয়োজন। সুপার শপে যে চকলেটের প্যাকেটমূল্য এক হাজার টাকা, সেটির পরিবর্তে বিশ টাকার ১ কেজি গাজর, দুধ, চিনি, কোকো পাউডার ব্যবস্থা করে ৫০ টাকায় চকলেটতুল্য হালুয়া পেতে পারি। চায়না থেকে যে আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনটি ১০ লাখ টাকায় কিনে আমরা ব্যবহার করছি। সেখানে ১টি কম্পিউটার আর সাউন্ড পাঠানোর প্রোব ছাড়া আর কিছুই নেই। অর্থাৎ ১ জন ইঞ্জিনিয়ারের সহায়তায় ১ লাখ টাকায় আমরা সেটা তৈরি করতে পারি। এভাবে ইমপোর্ট সাবস্টিটিউট পণ্য তৈরি করে একসময় যেভাবে জাপান উন্নত দেশে পদার্পণ করেছিল, আমরাও সেদিকে যেতে পারি।

আমরা যদি দেশীয় সবজি, ফল, করলা এর গুণাগুণ একটু স্টাডি করি দেখব মেলা মেলা গুণ। করলার মধ্যে ভিটামিন-এ, ভিটামিন ‘সি’সহ অনেক উপাদান আছে, যা ডায়বেটিস প্রতিরোধসহ হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস ভালো রাখাসহ সেল ক্যানসার প্রতিরোধী হিসেবে কাজ করে। প্রতিদিন হরীতকী খেলে ফুসফুসের কাশি ও হাঁপানি দূর হবে সঙ্গে কিডনিও ভালো থাকবে। আর বহেরা খেলে কঠিন আমাশয় দূর হবে।

কথায় আছে ফুসফুস ঠিক থাকলে বডি ফিট। রোগী দেখার পর চিকিৎসকেরা প্রেসক্রিপশনে এখন থেকে করলা, আমলকী, হরীতকী, বহেরা ইত্যাদি লেখা হলে ডায়াবেটিস, কাশি, হাঁপানি, আমাশয় বাবদ যে ৮ হাজার কোটি টাকার ওষুধ ব্যবহার হয়, তার আর প্রয়োজন হবে না। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় মাছের সঙ্গে স্বল্প মূল্যের করলা, কমলা, বেল, টমেটো, হরীতকী, বহেরা, আমলকী, লেবু থাকলে আমাদের শরীরের শক্তি যে পর্যায়ে পৌঁছাবে, সেখানে রোগবালাইয়ের পাশাপাশি করোনাকে রাখবে দূরে। শরীরের অ্যান্টিবডিগুলো আর্মি–পুলিশের মতো নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে এবং দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সিস্টেম হবে সুরক্ষিত।

রোগের চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধ অনেক ভালো। ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দেন কিউর’ রোগ প্রতিরোধের জন্য সবার সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। যেমন এলাকায় ১টি নর্দমা/ময়লার আধারস্থল পুরো এলাকার হাজারো সচেতন মানুষের জীবন নিয়ে নিতে পারে। সারা দিন যাঁরা মাস্ক পরে চললেন, সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে চললেন, যাঁরা অনেক সচেতন ছিল, সেই মানুষ লিফটের ইনফেকটেড সুইচ দেওয়ার সময় যাতে করোনায় আক্রান্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

লেখক: মো. হাবিবুল কিবরিয়া, ফার্মাসিস্ট (গ্র্যাজুয়েট), কেন্দ্রীয় ঔষধাগার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
Close
Close