রুপচর্চা

ত্বকের যত্নে লেবু

লেবু কম বেশি আমরা সবাই খেয়ে থাকি। লেবুর ঘ্রাণে আকুল হওয়ার দৃশ্যটা বোধ করি বাঙালি পরিবারের খাবার টেবিলে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। লেবুর ব্যবহার আছে রূপচর্চায়ও। জেনে নেওয়া যাক বিশেষজ্ঞ মতামত।

সৌন্দর্যচর্চায় লেবুর সর্বোৎকৃষ্ট উপকার পেতে হলে লেবু খেতে হবে

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চর্মরোগ বিভাগের অধ্যাপক হরষিত কুমার পাল বলেন, সৌন্দর্যচর্চায় লেবুর সর্বোৎকৃষ্ট উপকার পেতে হলে লেবু খেতে হবে। অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে লেবুর অ্যাসকরবিক অ্যাসিড। ফলে কোষের অভ্যন্তরীণ ক্রিয়া–বিক্রিয়ায় (কোষের বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে জড়িত) স্বাভাবিক নিয়মে যে ক্ষতি হওয়ার, তা অনেকটাই কম হয়। ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখতেও সহায়তা করে। তবে লেবুর রসমিশ্রিত প্যাক ত্বকে ব্যবহারের পর কারও কারও ত্বকে জ্বালাপোড়া হতে দেখা যায়, কারও কারও অ্যালার্জিজনিত সমস্যা ও প্রদাহ হতে পারে। তাই এ ধরনের প্যাক ব্যবহার করতে চাইলেও কিছু বিষয়ে সতর্কতা আবশ্যক।

ত্বক ও চুলের যত্নে লেবু উপকারী, জানালেন হার্বস আয়ুর্বেদিক স্কিন কেয়ার ক্লিনিকের আয়ুর্বেদিক রূপবিশেষজ্ঞ আফরিন মৌসুমী। তিনি বললেন, মনে রাখতে হবে, লেবুর রস সাইট্রিক অ্যাসিড। তাই এর ব্যবহার না জেনে যেকোনো ধরনের ত্বকে সরাসরি প্রয়োগ করা উচিত নয়। হিতে বিপরীত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ত্বক লাল হয়ে যেতে পারে। বলিরেখাও পড়তে পারে। ত্বকের ধরন বুঝে নিয়ম মেনে ব্যবহার করলে ত্বক হয়ে উঠবে সুন্দর।

ত্বকের ধরন বুঝে নিয়ম মেনে লেবু ব্যবহার করলে ত্বক হয়ে উঠবে সুন্দর

প্যাক হিসেবে পাতিলেবু ব্যবহার করাই ভালো। তবে এ লেবু সারা বছর পাওয়া যায় না। তাই অন্য লেবুও কাজে লাগাতে পারেন। আফরিন মৌসুমী জানালেন রূপচর্চায় লেবুর সঠিক ব্যবহার।

মুখের ত্বকে

তৈলাক্ত ত্বক অনেক সময় কালচে ও মলিন দেখায়। ব্রণ হওয়ার প্রবণতাও থাকে। যাঁদের ত্বক তৈলাক্ত, তাঁদের জন্য এই প্যাক।

গ্রেডারের সাহায্যে লেবুর খোসার সবুজ অংশটা কুচি করে নিতে পারেন। কুচি করা খোসা বেটে নিন (পেস্ট করুন)। ১ টেবিল চামচ লেবুর খোসার পেস্ট, ৩-৪ টি পুদিনাপাতা, ৬-৭টি তুলসীপাতা ও ২ চা-চামচ মুলতানি মাটি পেস্ট করুন পানি ছাড়া। পুরোটা মুখে মেখে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন। সপ্তাহে দুই দিন ব্যবহার করলে ত্বকে উজ্জ্বলতা আসবে।

অতিসংবেদনশীল ত্বকে লেবুর রস ব্যবহার করতে হবে সতর্কতার সঙ্গে

স্বাভাবিক ও শুষ্ক ত্বকের জন্য ১ চা-চামচ লেবুর রস, ১টি ডিমের কুসুম, ১ চা-চামচ মধু, ৬-৭ ফোঁটা জলপাই তেল ও ২ চা-চামচ গমের ময়দা মিশিয়ে প্যাক তৈরি করুন। ১৫ মিনিট পর মুখ ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে দুই-তিন দিন ব্যবহার করুন। এই প্যাক ত্বক উজ্জ্বল করে এবং বলিরেখা দূর করে।

অতিসংবেদনশীল ত্বকে লেবুর রস ব্যবহার করলে চুলকানি হতে পারে। অন্যান্য সমস্যাও দেখা যায়। তাই এই ত্বকে লেবুর রস ব্যবহার না করে লেবু ব্যবহার করতে হবে একটু ভিন্নভাবে। লেবুর খোসার ভেতরের সাদা অংশ (সবুজ অংশ এবং লেবুর ভেতরের সাদা পর্দার মতো অংশ বাদ দিয়ে) পেস্ট করুন। ১টি লেবু থেকে কমবেশি ১ চা-চামচ পরিমাণ পেস্ট পাওয়া যায়। ১ চা-চামচ পরিমাণের সঙ্গে ১ টেবিল চামচ মুগডালের বেসন, কয়েক ফোঁটা গ্লিসারিন ও ভিটামিন ই ক্যাপসুল (ক্যাপসুলের ভেতরে থাকা তরল ওষুধ) মিশিয়ে প্যাক তৈরি করুন।

প্যাক দিয়ে ১০ মিনিটের মধ্যে মুখ পরিষ্কার করে ফেলুন। সপ্তাহে এক-দুই দিন ব্যবহার করতে পারেন। মুগডালের বেসন অতিসংবেদনশীল ত্বকের জন্য চমৎকার ক্লিনজার। অতিসংবেদনশীল ত্বকে অনেক সময় তৈলাক্ত ভাব ও বলিরেখা একই সঙ্গে দেখা দিতে পারে। এই সমস্যা কমিয়ে আনতেও এই প্যাক উপকারী।

২টি লেবুর খোসা, আধা কাপ লেবুর রস (২টি লেবু থেকেই মোটামুটিভাবে এই পরিমাণ রস পাওয়া যায়), ৬ টেবিল চামচ সুজি, ৬ টেবিল চামচ হলুদের রস, ২টি ডিমের সাদা অংশ, ২ টেবিল চামচ জলপাই তেল ও ৩ টেবিল চামচ বাদামি চিনির মিশ্রণ শরীরের ত্বকে ব্যবহার করতে পারেন সপ্তাহে এক দিন। ১০-১৫ মিনিট পর তোয়ালে দিয়ে ঘষে ঘষে তুলে ফেলুন। ত্বকের মৃত কোষ সরে যাবে, ত্বক উজ্জ্বল হয়ে উঠবে, ত্বকের বিভিন্ন স্থানের রঙের অসামঞ্জস্য দূর হবে।

যেকোনো ধরনের ত্বকের জন্য এই স্ক্রাব কার্যকর। তবে হলুদের রস সরাসরি ব্যবহার করা ঠিক নয়। সরাসরি হলুদের রসের সঙ্গে লেবুর মিশ্রণ করা হলে ত্বকে জ্বালাপোড়া হতে পারে। তাই আগে হলুদ ছেঁচে রস বের করে নিয়ে ২-৩ মিনিট ফুটিয়ে নিন। এভাবে জ্বাল দিয়ে রাখা রস ফ্রিজে সাত দিন পর্যন্ত রেখে ব্যবহার করা যায়। ডিপ ফ্রিজে আরও বেশি দিন রাখা যায়। লেবুর খোসায় আছে এসেনশিয়াল তেল। বাদামি চিনির পরিবর্তে সাদা চিনি কাজে লাগাতে পারেন। তবে বাদামি চিনি বেশি ভালো।

অধ্যাপক হরষিত কুমার পাল জানালেন, যে প্যাক ব্যবহার করতে চান, সেটি তৈরি করে কানের পেছনের ত্বকে খানিকটা লাগাতে পারেন। সঙ্গে সঙ্গে কোনো প্রতিক্রিয়া হলে সেই প্যাক তখনই পরিত্যাগ করবেন। কোনো সমস্যা না হলে প্যাকের জন্য প্রযোজ্য সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। ১৪ দিন পর আবার একই প্যাক একই নিয়মে একই জায়গায় একইভাবে ব্যবহার করুন। কোনো সমস্যা না হলে ৭-১৪ দিন পর পুনরাবৃত্তি করুন। এরপর কোনো সমস্যা না হলে ধরে নেওয়া যায় প্যাকটি আপনার জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে না। তাহলে পরদিন থেকে প্যাকটি ব্যবহার করতে পারবেন। কোনো কোনো সমস্যা দেখা দিতে একটু বেশি সময় লাগে। তাই এই পদ্ধতি। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময়ে কানের পেছনের ত্বকে কোনো ধরনের সমস্যা হলে অবস্থানগত কারণে সেটির চিকিৎসা করাতে হবে।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
Close
Close