গল্পসাহিত্য

উদ্ভ্রান্ত হাসি

একটি ছন্দহীন জীবনের ছন্দময় গল্প

সকাল সকাল কাকের আওয়াজে ঘুম ভাঙলে কার না মেজাজ খারাপ হয়!

আজকের দিনটা যেন অনেক ভাল হয় সেজন্য কাল রাতেও অনেক সময় করে সবকিছু গুছিয়ে রেখেছিল হিমেল। কারন আজকের দিনটা তার জন্য অনেক গুরত্বপূর্ন। মাসের খুব কম দিনই এত সকালে উঠে সে। তবে আজকের দিনটা আলাদা। সচরাচর সকালে ঘুম ভাঙ্গেনা হিমেলের। তাই সকালের খাওয়াটাও হয়না। তবে আজ সকালে খাবে সে। তাই সকাল ৮টায় মোবাইলে এলার্ম দিয়ে অনেক সুন্দর একটা বাজনা রেখেছিল এলার্ম টোন হিসাবে। কিন্তু এলার্ম বাজার ঠিক কয়েক মিনিট আগেই নচ্ছার কাকটা ডেকে সব ভন্ডূল করে দিল।

বাধ্য হয়ে ৭:৫১তে ঊঠে পড়লো হিমেল। ঊঠবার পর কাল রাতে বাবলুদা কে রাতে ডেকে উঠিয়ে কেনা নতুন রেজার আর ব্রাশ নিয়ে ওয়াশরুমে গেল। ব্রাশ শেষ করে ফোম লাগিয়ে যেই না শেভ করতে শুরু করবে, এলার্ম বাজতে শুরু করলো। ভুলে এলার্ম টাই বন্ধ করা হয়নি মনে পড়লো। বাধ্য হয়ে এলার্ম যেই না বন্ধ করতে ওয়াশরুম থেকে বের হলো, এক ঝটকায় ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো রাকিব। আর রাকিব একবার ঢুকলে আধা ঘন্টার আগে বের হয়না। বাধ্য হয়ে শেভ না করেই বের হলো হিমেল। কারন আজকে কোন ভাবেই দেরী করা যাবেনা। আজ একটি বিশেষ দিন যে।

বের হয়ে সকালে নাস্তা করলো। নাস্তা জিনিসটা কি সেটা প্রায় ভুলতেই বসেছিল সে। নাস্তা শেষে বের হয়ে বাস স্ট্যান্ডে দাড়াল। এরপর কি মনে করে উবার নিল হিমেল। প্রায় দু’বছর পর বাসে না গিয়ে উবার নিল হিমেল। একটু বেশিই খরচ হবে জেনেও আজকের জন্য নিচ্ছি ভেবে নিয়ে নিল। উঠার পর ড্রাইভার কে গন্তব্যস্থান বলার পর ড্রাইভার হিমেল কে জিজ্ঞেস বললো-

স্যার এর আজকে মনটা অনেক ভাল হচ্ছে?

অনেকদিন পর স্যার ডাক টা শুনে হিমেলের খুব ভাল লাগলো মনে মনে। প্রতিদিন বাসের হেলপার দের কর্কশ স্বরে ভাড়া চাইবার কথা শোনার জন্যই হয়তোবা এত বেশি ভাল লাগলো। মনে মনে ভাল লাগাটা চেপে ধরে হালকা একটু হাসি নিয়ে হিমেল বললো-

জ্বী, আজকে আমার জন্য একটি বিশেষ দিন। এই জন্য মনটা একটু ভাল।

আমার ও মনটা আজকে ভাল স্যার। অনেকদিন পর দেখলাম কেও হাসি নিয়ে উঠলো, দেখতেই ভাল লাগে।

গাড়ি চলতে শুরু করলো। হিমেল আরেকবার হাতের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখলো। প্রায় নয়টা বাজে। এখনো প্রায় ঘন্টা দুয়েক সময় আছে। মনের অজান্তেই গুনগুন করে গান গাইতে শুরু করলো। গানের গলা ভাল না হলেও গুনগুন করে গাইতে সব সময়ই ভাল লাগে হিমেলের। বারোটা বাজার আগেই পৌছে গেল হিমেল। গাড়ি থেকে নেমে আরেকবার ঘড়ি দেখে বুঝলো সে। এরপর এগিয়ে কিছুক্ষন হাটবার পর সেই চিরচেনা ক্যাফে তে পৌছল।

অনেক কিছুই বদলে গেছে এখানে, শুধু সেই কফির গন্ধটাই আগের মত আছে। এগিয়ে গিয়ে একটা চেয়ারে বসার পর কফিশপের একজন কর্মচারী এগিয়ে আসলো।

স্যার, কি দিবো?

বাহ, দিনে দু’বার স্যার শোনার পর আরো ভাল লাগলো হিমেলের। সিদ্ধান্ত নিল আজ একটু বেশিই টিপস দিবে সে। এবারো মনের ভেতর আনন্দ চাপা রেখে বললো-

একটা কোল্ড কফি আর একটা ব্লাক কফি দাও।

ঠিক আছে স্যার।

কিছুক্ষন পর অর্ডার রেডি হবার পর কর্মচারী জিজ্ঞেস করলো-

স্যার, আপনার অর্ডার রেডি হয়ে গেছে। সাথের জন আসার পর দিবো?

না, এখনই দিয়ে দেন। দুইটাই আমি খাবো.

একই সাথে গরম আর ঠান্ডা কফি খাওয়ার কথা শুনে একটু অবাক হলো কর্মচারি। দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করার পরই একই উত্তর পেয়ে কফি দিয়ে গেল সে। এর প্রায় ৩০ মিনিট পর হিমেল কর্মচারি কে ডাকলো।

বিল কত হয়েছে?

১৬০ টাকা, স্যার। কিন্তু আপনি তো কফি একটুও খাননি। কোন সমস্যা স্যার? চেঞ্জ করে দিবো? নাকি অন্য কেও আসবে? আসলে বলুন, এটা নিয়ে আরো দুটো দিচ্ছি।

ন্যা, সমস্যা নেই। কফি ঠিক আছে। আপনি বিলটা দিয়ে যান।

বিল মেটানোর জন্য ৫০০টাকার একটা নোট তার হাতে দিয়ে বাইরে বের হয়ে আসলে হিমেল। গাড়ির ভাড়া আর কফির বিল শেষে পকেটে যে খুচরা ৬৩টাকা ছিল সেটা রাস্তার পাশের একজন ভিক্ষুক কি দিয়ে দিল সে। পকেটের সব টাকা শেষ হয়ে গেল। তাতেও মন খারাপ হলোনা হিমেলের। আজ যে কোন ভাবেই মন খারাপ করা যাবেনা, কারন আজ বিশেষ একটা দিন। আজ যে জানুয়ারির ১৭ তারিখ। আজ অপর্নার জন্মদিন। তিন বছর আগে অপর্নার বিয়ে না হলে প্রতিবার এর মতই এবারো হয়তোবা আজকের দিনটা তে চিরচেনা এই কফিশপে তারা এক হতো ঠিক এই সময়ে। কারন, সময় নিয়ে অনেক কড়াকড়ি ছিল যে অপর্নার। তাই অন্যদিন দেরী করলেই আজ সুন্দর করে অপর্নার দেওয়া ঘড়ি পড়ে ঠিক সময়মত আসতো হিমেল। কিন্ত আজ তা হলোনা। কারন জীবনের কোন এক মোড়ে দুজন দু’দিকে চলে গেছে যে হিমেল আর অপর্না।

বিয়ের দিন পালিয়ে এসেছিল অপর্না হিমেলের কাছে। কোন কিছু না ভেবেই হিমেলের সাথে কোথাও যাবার জন্য প্রস্তুতও ছিল সে। যাবার কথা বলার পর হিমেল বলেছিল-

কোথায় যাবো তোমাকে নিয়ে বলো? এই মেসের ভাড়াটাও দিতে পারিনা ঠিকমত। তোমাকে কিভাবে সুখে রাখবো বলো?

জবাবে অপর্না বললো-

আমি তো চাকরি পেয়েছি। তুমি চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত না হয় আমার টাকায় দুজনের ছোট্ট সংসার টা চালালাম।

কিন্তু তোমার এতদিন ধরে দেখা এত স্বপ্ন?

আমরা এক সাথে থাকলে কখনো না কখনো তো আমরা সব করতে পারবো।

আর বাবা মা? তোমার বাবা মা তো আমাকে মেনে নিবেন না বলেই তোমার বিয়ে ঠিক করেছেন আরেকজন এর সাথে। মানবেনই বা কেন বলো, এতদিনে একটা চাকরি পেলাম না।

বাবা মা কে পরে আমি বুঝিয়ে বলবো।

এটা বলার সময় অপর্নার গলায় চাপা একটা দুঃখের আওয়াজ হিমেল বুঝতে পারলো। এতদিন এক সাথে ছিল তারা। বাকিদের কাছে লুকাতে পারলেও হিমেলের কাছে তাই লুকাতে পারলোনা অপর্না তার কষ্ট। অনেক কথার শেষে হিমেল রাজি হল। মেসে থেকে বের হয়ে বাসে উঠলো দুজন। বাস চলবার সাথে সাথে হিমেলের কাধে মাথা রেখে অপর্না নতুন করে ছোট ছোট স্বপ্ন বুনতে লাগলো। হটাত করে সবকিছু কেপে উঠলো।

৩দিন পর হিমেলের জ্ঞান ফিরলো। জ্ঞান ফেরার পর দেখলো তার পাশে তার বন্ধু রাকিব। রাকিবকে অপর্নার কথা জিজ্ঞেস করলে রাকিব জানালো যে এক্সিডেন্টে হিমেলের মাথায় প্রচন্ড আঘাত লাগে। তিন দিন পর জ্ঞান ফিরেছে তার। আর অপর্নার বাবা মা দু’দিন আগে এসে অপর্না কে নিয়ে গেছে। অপর্নার আঘাত খুব বেশি লাগলেও একটু ভাল হলেই অন্য হাসপাতালে নিয়ে গেছে। হিমেল ফোন দিতে চাইলে ডাক্তার বললো যে এই মুহূর্তে কোন ভাবেই ফোন দেওয়া যাবেনা।

এর সাত দিন পর হিমেল হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেল। মাঝে বেশ কয়েকবার রাসেলের ফোন দিয়ে ফোন দেবার পরও অপর্নার নাম্বার এ কল ঢুকেনি। হিমেল ভাবলো তার নিজের মত অপর্নার ফোন ও তো ভেঙ্গে গেছে। এই জন্যই হয়তোবা যাচ্ছেনা। হাসপাতাল থেকে বের হয়েই অপর্নার বাসার সামনে গেল সে। অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে থাকার পরও কেও বের না হলে দারোয়ান এর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

এখানে চার তলার ভাড়াটিয়ারা কেও বাসায় নেই?

আপনে কেডা?

আমার এক বন্ধুর ফ্যামিলি থাকে চার তলায়। কিছুদিন আগে এক্সিডেন্ট হয় একটা।

অহ, আপনে অপর্না আপার বন্দু। অনেক ভালা মানুষ ছিল আপা।

ছিল মানে? এখন কোথায়?

আপনে জানেন না? অনার তো বিয়ার দিন একশিডেন্ট হইচিল। এরপর অনার যার সাথে বিয়া অইবার কথা আছিল উনি চাইর পাচদিন আগে অনারে নিয়া গেছে আম্রিকা না লন্ডন এ। অখানেই দাক্তার দেখামু কইছে। উনিও অনেক ভালা মানুশ। আপার আব্বা আম্মাও লগে গেছে।

দারোয়ান কে ধন্যবাদ দেয় হিমেল। এরপর বের হয়ে কিছুক্ষন হাটার পর একটা পার্কে বসে মানিব্যাগ বের করে। মানিব্যাগে অপর্নার ছবি আর ভেতরে ১৫৬টাকা আছে। একবার, দু’বার, তিনবার করে বেশ কয়েকবার টাকা গোনার পরও ১৫৬টাকাই থেকে যায়। টাকা গুলো হাতে নিয়ে বসে থাকে সে। মেঘে ছেয়ে আসা আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতে শুরু করে সে, ১৫৬ টাকা দিয়ে কি ‘আম্রিকা’ বা ‘লন্ডন’ যাওয়া যায়!

ঠিক ৩ মাস পর অপর্নার বিয়ের খবর পায় হিমেল। এখনো মাঝে মাঝে ভাবে সে, অপর্না কি আসলেই তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিল? চিঠি লিখেছিল? ভাবতে ভাবতে এক সময় ভাবা ছেড়ে দেয় সে। মাঝে মাঝে শুধু না চাইতেই মনে পরে এসব। দিনগুলো তো চলেই যায়, শুধু একটু খারাপ লাগে হঠাত হঠাত।

তবে আজ এর ব্যাতিক্রম। আজ মন খারাপ নেই হিমেলের। আজ যে অপর্নার জন্মদিন!

পুনশ্চঃ অপর্না সুস্থ হবার পর হিমেলের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিল কিনা জানিনা। হয়তোবা না জানাটাই অপর্না আর হিমেলের গল্পের নিয়তি ছিল। প্রতিদিন কত ভালবাসার গল্পই তো শেষ হয়ে যায়! এত হিসেব রাখার সময় কার! হিমেলের সাথে যোগাযোগ করার পর যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল সে অপর্নার সাথে পরে আর যোগাযোগ করেছিল কি না, তখন সে একটা কাগজে চার লাইন এর একটা কবিতা লিখে দেয়ঃ

“কতনা যতনে, ছলনে, লুকিয়ে, রাখা থাকে ভালবাসা

তবুও সহসা হঠাত করে নাড়া দেয় মিছে আশা

ভালবাসা সে তো মুক্তের মত ভাল যে বাসিতে পারে

নির্দয় প্রানে সে ভালবাসা ঘাম হয়ে লুটায়ে পড়ে”

সমাপ্ত?!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
Close
Close